১৯৯৬ সালের আজকের দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ নায়ক সালমান শাহ। ছেলেকে ছাড়া ৩০ বছর কাটিয়ে দিলেন মা নীলা চৌধুরী। সালমান শাহর হত্যা মামলা, ডনের গ্রেপ্তার, সামিরা, শাবনূরসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইংল্যান্ড থেকে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেছেন নীলা চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিবাকর বিশ্বাস
১৯৯৬-২০২৬, কেটে গেছে ৩০ বছর। সালমান শাহ ছাড়া এ সময়টা কীভাবে কাটছে আপনার?
উত্তর: আমি তো সালমান শাহ ছাড়া নই। ওকে নিয়েই ৩০ বছর আমাদের কেটেছে, কাটছে, আগামীতেও কাটবে। ওকে ছাড়তে পারব না। ও আমার কলিজার ভেতর ছিল, কলিজার ভেতরেই থাকবে।
সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডনকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। কী বলবেন?
উত্তর: এটা অনেক আগে হওয়ার কথা ছিল। যেদিন মামলা হলো, সেদিনই আসামি গ্রেপ্তার হবে, রিমান্ড হবে—এমনটাই আশা ছিল। এতদিনে সব শেষ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। এটা সবার কাছে প্রত্যাশিত, অভাবনীয় কিছু না।
ডন দাবি করেছেন, ঘটনার দিন তিনি ঢাকাতেই ছিলেন না, গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় ছিলেন।
উত্তর: আজিজ মোহাম্মদ ভাই বলছেন, তিনি এখানে ছিলেন না। অথচ রিজভীর সাক্ষ্য বলে, সব অ্যাভিডেন্স বলে, তিনি ছিলেন। উনার টিকিট কাটা ছিল। রিজভীর সাক্ষ্যেই আছে ঘটনাটা। সকালে ডন, সামিরার মা, অন্যরা যারা ছিল, সকালে বের হয়ে গেছে। রিজভী সব বিবরণ দিয়েছে। ডন জড়িত ছিল, আমরা জেনেছি, শুনেছি। আগেও শুনতাম, ইমনের সঙ্গে ওর সখ্য নষ্ট হয়ে গেছে।
ডন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি সেদিন হরতালের জন্য বগুড়া থেকে আসতে পারেননি।
উত্তর: আপনারা পরীক্ষা করে দেখেন, ওইদিন হরতাল ছিল কি না। হরতাল কি এখনো ভাঙেনি? আমি তো লন্ডনে আছি। সে ফোন করে বলতে পারত, আপনি ভুল বুঝেছেন, অথবা ফেসবুকে বলতে পারত, মা, ভুল বুঝেছ, আমি তোমার ছেলের খুনি না। আমাকে বলে উল্টো চরিত্রহীন। ইমন নাকি আমাকে মেরেছে। ও নাকি বগুড়ায়, তাহলে খুন না আত্মহত্যা—কীভাবে জানে? সে একগুঁয়ে ভাবে বলছে, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছে। এটা প্রমাণ করার জন্য ডন ওঠেপড়ে লেগেছে কেন? এটার পেছনেই তো মোটিভ আছে।
সালমান শাহর সঙ্গে আপনার শেষ কথা কী হয়েছিল?
উত্তর: ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ফোন দিয়েছিলাম ওকে বাসায় আসতে বললাম। ও বলল, সোনা আম্মা, আমাকে যেতে বলো না। ফোনে বলো কী দরকার? বললাম, তোমাকে আসতে হবে। জরুরি কথা আছে তোমার ব্যাপারে। সাড়ে ৭টার দিকে ওর বাবা গেলেন ওখানে। বলল, সাড়ে ৮টায় আসবে। আর আসা হলো না।
সালমান শাহর মৃত্যুর খবর কীভাবে পেলেন?
উত্তর: বাসায় একটা ফোন এলো। ইমনের আব্বা ধরলেন। ওপাশ থেকে বলল, ভাইয়ার যেন কী হয়েছে। দেখতে হলে তাড়াতাড়ি আসেন। তখন আমরা খেতে বসেছিলাম, সিলেট যাব। ভাত ফেলে দিয়ে তালা দিয়ে চলে গেলাম। বের হয়ে দেখলাম, রাস্তায় লোক দৌড়াচ্ছে। ওর বাসার সামনে গিয়ে দেখি, প্রচুর লোক। বাসায় ঢুকে ওকে বিছানায় শোয়া দেখলাম। আবুল আর একটা মেয়ে তেল দিচ্ছে গায়ে। সামিরাকে পাশে দেখিনি। আমরা তাকে নিয়ে গেলাম হলি ফ্যামিলিতে। কিন্তু ওরা রাখল না।
সামিরাকে নিয়ে এই প্রসঙ্গে কী বলবেন?
উত্তর: সামিরা সবসময়ই দোষী থাকবে। কারণ সে তার স্ত্রী ছিল। সে ঘরে ছিল এবং আজ পর্যন্ত সে কান্নাকাটি করেনি। সে আমাদের জানায়নি। আমাদের না জানিয়ে সে লাশ নামিয়ে ফেলল, গোসল করিয়ে ফেলল? ইমন মারা গেছে—খবরটাও দিল না। সে ভেবেছে পার পেয়ে যাবে। সে বলেনি, ইমন মারা গেছে। ঢাকা মেডিকেল বলল, মারা গেছে। আমরা বিশ্বাস করিনি।
সামিরা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সালমান শাহ-শাবনূরকে জড়িয়ে চিত্রালিতে বিভিন্ন খবর বের হয়েছিল তখন। সালমান–শাবনূরের সম্পর্ক নিয়ে কী বলবেন?
উত্তর: একটা খুনকে আড়াল করার জন্য অনেক অবান্তর কথা হবে। অভিনয়ের জন্য সালমান শাহর সঙ্গে তো যত নায়িকা ছিল, সবার সঙ্গেই সম্পর্ক ছিল। শাবনূর ইমনের বেশিরভাগ সিনেমার নায়িকা ছিল। ইমন ওকে তুই-তোকারি করত। অভিনয় করতে গিয়ে তো প্রেম করছে, জড়িয়ে ধরেছে, চুমু খেয়েছে—ওটাই কি সব? কোনো প্রেম ছিল না। সামিরা তো সবসময় সঙ্গে থাকত। এটা একটা ষড়যন্ত্র। আজিজের পয়সা খেয়ে হলুদ সাংবাদিকরা ওর ক্যারিয়ার নষ্টের চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে জড়িত ছিল সামিরাও।
সালমান-সামিরার ঝামেলা আসলে কী নিয়ে হতো?
উত্তর: প্রথমে হতো রনিকে নিয়ে। সালমান শাহ কেন শুটিংয়ে যায়? সামিরার কথা কেন শুনল না, ওকে নিয়ে কেন বাইরে গেল না—এসব নিয়ে। সারা দিন ঘরে আজেবাজে লোক থাকত, ডন থাকত। ইমন চলে যেত শুটিংয়ে, চাকররা মাঝেমধ্যে এটা-ওটা দেখত। মনসুর বলেছে, কী দেখেছে। আমার সঙ্গে কন্টাক্ট করতে না পারে, এজন্য টেলিফোনটাও নষ্ট করে রেখে দিয়েছিল। ওদের গণ্ডগোল হতো এসব নিয়ে।
ডন গ্রেপ্তার হয়েছেন, সামিরা এই মামলার আসামি। তাকে নিয়ে কী বলবেন?
উত্তর: সামিরা আরও খারাপ হয়ে গেছে। সে নিজেই প্রমাণ করে দিয়েছে, সে আসামি এবং সে সব জানে। সে হাতে মারেনি, ভাতে মারছে। সে সবকিছুতে জড়িত ছিল। তার মা ইন্ধন জুগিয়েছে। সামিরার মা, বাবা, আজিজ মোহাম্মদ ভাই—সব এক হয়ে গিয়েছিল।
সালমান শাহর লাশ যখন ঢাকা থেকে সিলেট নিয়ে যান, সেদিন অবস্থাটা কেমন ছিল?
উত্তর: কোনো স্মৃতি নেই। কান্না করছি আর শুধু বলেছিলাম, চলো সিলেট যাই। কীভাবে গেছি জানি না। গাড়ি একটা জায়গায় থামার পর চার বোতল পানি খেয়েছি। আমার সামনে হাজব্যান্ড লাশ নিয়ে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছি। আমার তখন জ্ঞান নেই।
সামিরা কেন লাশের সঙ্গে সিলেট যাননি সেদিন?
উত্তর: আমি ফোন দিয়েছি সামিরার বাবার নম্বরে। বলেছি, ইমনের লাশ দাফন হবে, সামিরাকে পাঠান। ওর বাবা বলেছে, সামিরা যাবে না। সামিরার বাবা-মায়েরও তো আসা উচিত ছিল।
সালমান শাহর মা হিসেবে এখন আপনার চাওয়াটা কী?
উত্তর: আমার ছেলে আঘাত পেয়েছে। যারা আঘাত করেছে, তাদের বিচার হোক। আমার ছেলেকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে, তার বিচার হোক। সামিরাসহ যারা মামলার আসামি, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক।
৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতি বছর এই দিনটা যখন আসে, আপনার সময় কীভাবে কাটে?
উত্তর: রোজ আমার কাছে ৬ সেপ্টেম্বর (কান্না)। ইমনের লাশটা বুকের ভেতর রেখে দিয়েছি। ও বুকের ভেতর আছে। আমি বিচার করিয়ে ছাড়ব। ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী নয়, আমার মৃত্যুবার্ষিকী। আমি ঘোষণা করলাম, ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ হত্যা দিবস। তাকে ওইদিন হত্যা করা হয়েছে। সেই হত্যার বিচার আমি রাষ্ট্রের কাছে চাই, বিশ্বের কাছে চাই। দেশে বিচার না হলে বিশ্বের যেখানে বিচার হবে, সেখানে যাব। বিচার আমি করিয়ে ছাড়ব।
Leave a Reply