দেব্রবত সরকার, গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী
“কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে…..”
কালজয়ী এই সংগীতটি যিনি পরিবেশন করেছিলেন সেই মায়াবী কণ্ঠস্ব্রের অধিকারিনি আজ লোকান্তরিত| গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ তিনি অমৃত লোকে গমন করেছেন| ইং ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্ম এই প্লেব্যাক গায়িকার| প্রায় ২০টি ভাষায় ১০,০০০ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করে তিনি নাম লিখিয়েছিলেন গ্রীনিস ওয়ার্ল্ডবুকে| বাংলা, মারাঠী, তামিল, ইংরেজিসহ ২০টি ভাষায় তার সংগীতের রেকর্ড ঘরে ঘরে বেজে চলেছে| “পিয়াতু আর তো আজ,” দম মারো দম, “চুরালিয়া হ্যাম তুমনেঃ সহ “চোখে চোখে কথা বলে”, “এই পথ যদি না হয় শেষ”, “যদি কাগজে লেখা নাম” ও “কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে” গানগুলো এখনো শ্রোতাদের আপ্লুত করে| আধুনিক থেকে পপ, গজল, ক্যাবারে রোমান্টিক চলচ্চিত্রের গান, লোকসংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীতে তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী| বাংলা গানে তার কণ্ঠে মাধুর্য ও আধুনিকতার এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়| তিনি জিতেছেন অসংখ্য পুরস্কার তন্মধ্যে একাধিক বার ফ্লিম ফেয়ার পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পদ্ম বিভূষণ, দাদা সাহেব কালকে ও গ্রিনেস ওয়াল্ডবুকে নাম উঠানো| সংগ্রাম, অধ্যাবসায় ও সৃজনশীলতা তাঁকে এই অর্জনে সহায়তা করেছে| সে হিসেবে অনুধাবণ করলে তিনি একটা যুগ, একটা সংস্কৃতি, একটা ইতিহাস|
কিংবদন্তী এই শিল্পীর পারিবারিক পরিবেশেও ছিল সঙ্গীতের আধিক্য| বাবা দীননাথ মুঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের পণ্ডিত, লেখক ও নাট্যকর্মী| মা শিবান্তী মুঙ্গেশকর ছিলেন গৃহিণী| অনেকে তাকে সুধামতি নামেও ডাকতেন| আশাজীরা ছিলেন পাঁচ ভাইবোন| তিনি ছিলেন সকলের ছোট তার বড় বোনও একজন কিংবদন্তি শিল্পী লতা মুঙ্গেশকর| একমাত্র ভাই হৃদয় নাথ মুঙ্গেশকর ও ছিলেন সংগীতজ্ঞ ও বিশিষ্ট সুরকার| বোন মিনা খাদিকরও ছিলেন সংগীতজ্ঞ ও গীতিকার| অন্য আর এক বোন উষা মুঙ্গেশকর ছিলেন একজন প্লেব্যাক গায়িকা|
আশাজীর খুব কম বয়সে বিয়ে হয় গণপাত্র ভোসলের সঙ্গে| কিন্তু বিয়েটা বেশি দিন স্থায়ী হয় না| অল্প কিছু দিনের মধ্যে তাদের দাম্পত্য জীবন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়| এই গণপাত্র ভোসলে ছিলেন কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী আশাজীর আপন বড়বোন লতা মুঙ্গেশকরের সচিব| আশাজী পরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন আর এক সংগীত বিশারদ আর ডি বর্মনের সঙ্গে| দ্বিতীয় বিবাহের পরেই আশাজীর সংগীত জীবনের প্রবাহ বৃদ্ধি পেতে থাকে|
আশাজীর সংগীত জীবন শুরু ৯ বছর বয়স থেকে| কম বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর দুই বোন লতাজী ও আশাজী সংসারের দায়িত্ব কাধে তুলে নেন| প্রথমে তিনি বি-গ্রেড সিনেমা এবং কম বাজেটের সিনেমায় প্লেব্যাক করতেন| এইভাবে ধীরে ধীরে তিনি বলিউডে প্রতিষ্ঠা পান|
ইং ১৯৬০ এর দশকে আর ডি বর্মন এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নতুন ধারার বাংলা গান সৃষ্টি করেন| বাংলা গানকে আন্তজার্তিক স্তরে উপস্থাপন করার জন্য এই জুটি সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রেখেছে| অন্য দিকে হেলেনের নাচের গানে তার কণ্ঠ ছিলো বিশেষ জনপ্রিয়| ব্যক্তিগত জীবনে আশাজীর তিন সন্তানের জননী| দুই ছেলে হেমন্ত ভোসলে পাইলট ও ছোট ছেলে আনন্দ ভোসলে ব্যবসা ও মায়ের সচিব| একমাত্র মেয়ে ভরসা ভোসলে সংবাদিক ও লেখক হিসেবে পরিচিত| এই কিংবদন্তী শিল্পী লোকান্তরিত হওয়ায় আমরা বেদনাহত হৃদয়ে প্রাথনা করি করুণাময়ের নিকট হে বরেণ্য শিল্পী
-“আনন্দলোকে মঙ্গঁলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর|”
Leave a Reply