লেখক: এডভোকেট সুশান্ত অধিকারী
বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক মাসে সনাতনী (হিন্দু) সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর ধারাবাহিক হামলা ও হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বাস্তবতার এই নির্মম চিত্র আমাদের ভাবিয়ে তুলছে—রাষ্ট্র কি তার সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে?
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, যুবক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত—কেউই এই সহিংসতার বাইরে থাকছেন না। এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয় না; বরং একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানানোর প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কয়েকটি নির্মম ঘটনার মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড, শরীয়তপুরের খোকন চন্দ্র দাসের মর্মান্তিক মৃত্যু, নরসিংদীর মনি চক্রবর্তী, চঞ্চল ভৌমিকের আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগসহ একাধিক সহিংস ঘটনা। পাশাপাশি অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই ইঙ্গিত করে।
এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের খুরুশকুলে পুরোহিত নয়ন সাধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং সাম্প্রতিক সময়ে এক কাস্টমস কর্মকর্তার হত্যার ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এগুলো আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনে দেয়।
ধর্মের ভিত্তিতে একজন মানুষকে হত্যা করা শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? কেন অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় আসছে না?
বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা যদি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে, তবে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কোথায় সেই কঠোর পদক্ষেপ? কোথায় দৃশ্যমান বিচারপ্রক্রিয়া?
মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও সহিংসতা গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গুজব, ধর্মীয় উসকানি কিংবা পরিকল্পিত বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড এই সহিংসতার পেছনে কাজ করছে। ফলে ভুক্তভোগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, অনিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এই দেশ কোনো একটি ধর্মের নয়; এটি সকল মানুষের। এখানে কোনো নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নির্যাতিত হবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন—
১। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত
২। অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
৩। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা জোরদার
৪। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঘৃণার রাজনীতি বন্ধ করা।
আমরা সহিংসতা চাই না, প্রতিশোধ চাই না—আমরা চাই ন্যায়বিচার। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করুক। বাংলাদেশ কোনো একটি ধর্মের নয়—এটি সকল মানুষের। ধর্ম নয়, মানুষই হোক সর্বাগ্রে।
Leave a Reply