দেশের সিনেমা হল সংকট যেন কাটছেই না। প্রতি মাসেই দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে আসছে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর।
কোথাও হলের জায়গায় নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন, কোথাও আবার সেই জায়গা ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য বাণিজ্যিক কাজে। এবার একই দিনে বন্ধ হয়ে গেল কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ঐতিহ্যবাহী ‘মধুমতি’ এবং রংপুরের ‘শাপলা টকিজ’।
একটি হল ভেঙে ফেলার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অন্যটির ক্ষেত্রেও মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তে বন্ধ হয়ে গেছে দীর্ঘদিনের কার্যক্রম।
ফলে দেশের দুই অঞ্চলের দর্শক হারালেন পুরোনো দুটি সিনেমা হল।
ভৈরবে শেষ ভরসাটিও শেষ
একসময় ভৈরবে ছিল চারটি সিনেমা হল—‘ছবিঘর’, ‘পলাশ’, ‘মধুমতি’ ও ‘দর্শন’। সময়ের সঙ্গে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে ‘ছবিঘর’ ও ‘পলাশ’। ‘ছবিঘর’ এখন শপিং সেন্টার, আর ‘পলাশ’ হলের জায়গায় নির্মিত হয়েছে আবাসিক ভবন ও কিন্ডারগার্টেন।
এরপরও ভৈরবে টিকে ছিল ‘মধুমতি’ ও ‘দর্শন’। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে এসব হলে দর্শকদের উপচেপড়া ভিড় থাকত। ভৈরবের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি উপজেলার দর্শকরাও সিনেমা দেখতে আসতেন।
তবে সেই ধারাবাহিকতাও আর থাকল না। গত বৃহস্পতিবার থেকে বন্ধ হয়ে গেছে ‘মধুমতি’।
এরই মধ্যে শুরু হয়েছে হলটি ভেঙে ফেলার কাজ। সর্বশেষ সেখানে প্রদর্শিত হয়েছে সাইফ চন্দন পরিচালিত ‘মালিক’।
হল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের লোকসানের কারণে প্রেক্ষাগৃহটি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। কয়েক বছরে লোকসানের পাশাপাশি দেনাও বেড়েছে। গত দুই ঈদে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তাই শেষ পর্যন্ত হলটি পুরোপুরি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
১৯৭৮ থেকে পথচলা, থামল রংপুরের ‘শাপলা টকিজ’ও
রংপুরের ‘শাপলা টকিজ’ উত্তরবঙ্গের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে পরিচিত একটি নাম। ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রেক্ষাগৃহটি প্রায় পাঁচ দশক ধরে দর্শকদের বিনোদন দিয়ে এসেছে।
২০০৬ সাল থেকে হলটি ভাড়ায় পরিচালনা করছিলেন কামাল হোসেন। তাঁর দাবি, ২০৩২ সাল পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও মালিকপক্ষ আর সিনেমা হল হিসেবে জায়গাটি চালাতে চাইছে না। ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁদের হল বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
‘শাপলা টকিজ’-এর মূল মালিক ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। ২০০৭ সালে তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। পরে তাঁর ভাই এবং পরবর্তীতে উত্তরাধিকারীরা হলটির দায়িত্ব পান। সম্প্রতি তাঁরাই প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হলটি পরিচালনা করছি। এ পর্যন্ত চারবার তাঁদের সঙ্গে চুক্তিনামা নবায়ন করেছি। কিন্তু এবার আমার চুক্তির মেয়াদ থাকলেও তার আগেই আমাকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। মূল মালিকের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরিরা (ভাতিজারা) ওই জায়গায় সিনেমা হলের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করতে চাচ্ছেন। আমার সঙ্গে চুক্তি থাকা অবস্থায় এমনটা করাতে আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। গত বৃহস্পতিবার তাঁদের সিদ্ধান্ত আমাকে মেনে নিতে হয়েছে। আমি হলটি বন্ধ করে দিয়েছি। গত সপ্তাহে আমি পুরনো একটি ছবি চালিয়েছিলাম, শাকিব খানের ‘বলব কথা বাসর ঘরে’। কিছু দর্শক ছিল। নতুন ছবি হলে যেরকম দর্শক আসে সেরকম ছিল না।’
একদিকে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে হল বাঁচানোর উদ্যোগের কথা বলছে চলচ্চিত্র অঙ্গন। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ১৯টি সংগঠন মিলে যাত্রা শুরু করেছে নতুন একটি সংগঠনের।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুরোনো সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় ‘মধুমতি’ ও ‘শাপলা টকিজ’-এর পরিণতিও তাই নতুন করে ভাবাচ্ছে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের। দর্শক টানার মতো নিয়মিত ও মানসম্মত সিনেমার অভাব, লোকসান এবং হল আধুনিকায়নের ধীরগতির কারণে প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসা ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ফলে হল বাঁচানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
Leave a Reply