রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীর চাঞ্চল্যকর রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় আগামীকাল রোববার (৭ জুন) ঘোষণা করা হবে। ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ রায় ঘোষণা করবেন।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী।এদিন রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের দায় প্রমাণে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি জানান, যে ফ্ল্যাটে রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়, সেই ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা ভোর ৬টার সময় কাজে চলে যান। সেখানে শুধুমাত্র সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন ছিলেন। তাদের শয়নকক্ষের খাটের নিচ থেকে রামিসার গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলে স্বপ্না খাতুন দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর জানালার গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান সোহেল। যে সিল রেঞ্চ দিয়ে গ্রিল ভাঙা হয়েছিল, সেটিও তাদের খাটের নিচ থেকে পাওয়া যায়।
এ ছাড়া সোহেলের পালিয়ে যাওয়া পাশের বাসার এক ব্যক্তি দেখেছিলেন। পরবর্তীতে সেই ব্যক্তি আদালতে সোহেল রানাকে শনাক্ত করে জানান, তিনিই জানালা ভেঙে পালিয়ে যেতে দেখেছেন। এ ছাড়া তাদের ব্যবহৃত বাথরুমে রঙের বালতিতে পানি ভরে তার মধ্যে রামিসার মাথা ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষ আরও জানায়, প্রায় ৯ জন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী সোহেল রানার বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তাদের ঘরে রামিসার মরদেহ এবং বাথরুমে কাটা মাথা দেখতে পান। পরে পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানান, রামিসাকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল। পরে মাথা বিচ্ছিন্ন করার কারণে তার মৃত্যু হয়।
এরপর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে জানান, জবানবন্দি গ্রহণের আগে সোহেল রানাকে তিন ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছিল। এ ছাড়া তার সর্বোচ্চ কী সাজা হতে পারে, সেটিও তাকে জানানো হয়েছিল। সে সময় সোহেল জানিয়েছিলেন, পুলিশ বা অন্য কেউ তাকে জোরপূর্বক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেনি।
রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সোহেল যখন শিশুটিকে ঘরে নিয়ে এসে বাথরুমে ধর্ষণ করেন, তখন সেখানে তার স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। পরে মাথা কেটে আলাদা করা, হাত বিচ্ছিন্ন করা, মরদেহ খাটের নিচে রেখে দেওয়া এবং সোহেল রানাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার ক্ষেত্রেও স্বপ্না খাতুন ভূমিকা রাখেন। শুধু তাই নয়, তার সামনে অপরাধ সংঘটিত হলেও তিনি বাধা দেননি বা কাউকে জানাননি।
এ ছাড়া রামিসার মা দরজার সামনে মেয়ের স্যান্ডেল দেখে সে বাসায় আছে কি না জানতে চাইলে স্বপ্না খাতুন বলেন, রামিসা সেখানে নেই। পরে সবাই দরজায় ধাক্কাধাক্কি করলেও তিনি তা খোলেননি। এতে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া এবং মরদেহ গুমের চেষ্টায় তিনি সহায়তা করেছেন বলে যুক্তি তুলে ধরে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর।
অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী তার যুক্তিতে বলেন, হত্যায় ব্যবহৃত জব্দকৃত চাকুর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি। শুধুমাত্র ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে সর্বোচ্চ সাজা তথা মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, জবানবন্দিতে সোহেল রানা নিজেই জানিয়েছেন যে তিনি নিয়মিত মাদক গ্রহণ করতেন। রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার আগে তিনি মাদক গ্রহণ করে থাকতে পারেন। মাদকাসক্তির কারণে মানসিক বিকৃতি থেকে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সোহেল রানার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজা না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার আবেদন জানান রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কলিমুল্লাহ।
এ ছাড়া তিনি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে মরদেহ লুকানোর দায়ে সাত বছরের সাজা চেয়ে আদালতকে বলেন, তিনি ধর্ষণ বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা সোহেল রানা একাই করেছেন, যা তিনি তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন। তাই এ দায় থেকে দ্বিতীয় আসামি স্বপ্না খাতুনকে খালাস দেয়ার আবেদন জানান তিনি।
যদিও আসামিপক্ষের এসব যুক্তির খণ্ডন করেন রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর।
Leave a Reply