লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরে এক শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষক রিপন মজুমদারকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানোকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের জের ধরেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবক, পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (২ জুন) বিষয়টি নিয়ে দত্তপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য মায়া বেগম, অভিভাবক ফখরুদ্দিন শাহীন, নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহরিমা রাবেয়া সিপ্তি, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহিনা ফাতেমা সন্ধি, প্রত্যক্ষদর্শী অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জারিন সুলতানা সোহা এবং বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ফারিহা আক্তার রোমানার সঙ্গে কথা হয়। একইসঙ্গে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মামলার বাদীর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী জারিন সুলতানা সোহা জানান, ঘটনার দিন গণিতের প্রাইভেট ক্লাসে একটি সূত্র ভুল করার কারণে শিক্ষক রিপন মজুমদার কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করেছিলেন। তবে তিনি কোনো শিক্ষার্থীকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেছেন বা আপত্তিকর আচরণ করেছেন—এমন কিছু তিনি দেখেননি। তার ভাষ্য, “স্যারকে ফাঁসানোর জন্য এটি একটি ষড়যন্ত্র হতে পারে বলে আমার মনে হয়।”
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ফারিহা আক্তার রোমানা বলেন, “তিন বছর ধরে স্যার আমাকে বাসায় এসে পড়িয়েছেন। তিনি সবসময় অভিভাবকের মতো আমাদের দেখভাল করেছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে আমরা বিস্মিত। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন।”
অভিভাবক ফখরুদ্দিন শাহীন বলেন, “রিপন মজুমদার একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় শিক্ষক। আমার দুই মেয়েকেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে পড়িয়েছেন। তার আচরণে কখনো কোনো অসঙ্গতি লক্ষ্য করিনি। তাই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া জরুরি।”
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য মায়া বেগমের দাবি, বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী রিপন মজুমদারের কাছে প্রাইভেট পড়ায়, যা নিয়ে কিছু শিক্ষক অসন্তুষ্ট ছিলেন। তার মতে, “এই বিরোধের সুযোগ নিয়েই ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর মাও ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন যে তাকে চাপ প্রয়োগ করে অভিযোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, বিষয়টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভালো জানেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি।
দ্বন্ধের বা হিংসার বিষয়টি অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক আব্দুল সোবহান বলেন, অভিযোগ দিয়েছে ছাত্রীর মা। এখানে আমাদের কারো কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পিত ঘটনা কি না এমন প্রশ্নে তিনি সদুত্তরও দিতে পারেননি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দত্তপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মিজানুর রহমান বলেন, “অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের হওয়ার পর শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে।”
উল্লেখ্য, গত ২২ মে বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় অষ্টম শ্রেণির ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানোর সময় পড়া না পারায় কয়েকজনকে বেত্রাঘাত করেন শিক্ষক রিপন মজুমদার। পরে এক শিক্ষার্থীকে আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার অভিযোগ এনে ২৪ মে তার মা চন্দ্রগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। একই দিন পুলিশ শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
বর্তমানে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply