1. admin@sanataninews24.com : admin :
       
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৯ পূর্বাহ্ন
সংবাদের শিরোনাম
যশোরে পূর্ব শত্রুতার জেরে যুবককে জিআই পাইপ দিয়ে মারধরের অভিযোগ গাজীপুরে কালভার্টের নিচে লাগেজে মিললো নারীর মরদেহ বরিশালে দৈনিক সমকালের সাবেক ব্যুরো প্রদান পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্য প্রত্যাহারে আসিফ মাহমুদের আইনি নোটিশ পূবালী ব্যাংকে গ্রাহকের টাকা চুরি, অভিযুক্ত গ্রেফতার ঠাকুরগাঁওয়ে কষ্টিপাথরের মূর্তিসহ ২০০ বছরের পুরোনো স্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে বিজিবি ‘মানসিক কষ্ট আর নিতে পারছি না’—লিখে নিজেকে শেষ করলেন তরুণী এআই দিয়ে পর্নোগ্রাফি তৈরি করে সাবেক স্ত্রীকে ব্ল্যাকমেল, যুবক গ্রেপ্তার সংসদে সার সংকট নিয়ে দুই এমপির ভুল তথ্য, কৃষক নিহতের ঘটনা ১৯৯৫ সালে বেনাপোল সীমান্তে ভারতীয় নেশাজাতীয় সিরাপ উদ্ধার

গিরিশচন্দ্রের বাড়ি ইতিহাসের দুয়ারে দখল-আবর্জনা

  • প্রকাশিত সময় শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৪ বার পড়েছেন

পবিত্র কোরআন শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন। শুধু নরসিংদী বা বাংলাদেশ নয়, গোটা উপমহাদেশেরই একটি অতিপরিচিত নাম। তার প্রধান পরিচয় ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফ প্রথম বাংলায় অনুবাদক হিসেবে। বাংলা ভাষায় কোরআন শরিফের সার্থক ও পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ তিনিই প্রথম করেন। ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ ও ইসলামে পাণ্ডিত্যের কারণে ‘ভাই’ ও ‘মৌলভী’ তার নামের সঙ্গে যুক্ত।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নরসিংদী সদর উপজেলার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের পাঁচদোনা গ্রামে ১৮৩৪ সালে এক বিখ্যাত বৈদ্য দেওয়ান বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় তিনি মারা যান। তার ইচ্ছানুযায়ী গ্রামের বাড়ি পাঁচদোনাতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

সংস্কারের অভাবে আর দখলদারিত্বের চাপে শতবর্ষী বাড়িটি তার পুরোনো ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছিল। ২০০৮ সালে বাড়িটির মূল কাঠামো ঠিক রেখে সংস্কারে অনুদান দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে ভারতীয় হাইকমিশন। ২০১৫ সালে নরসিংদী জেলা প্রশাসন ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র ঐতিহ্য অন্বেষণের মধ্যে এক কোটি ২৮ লাখ টাকায় বাড়িটি সংরক্ষণ ও একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণের চুক্তি হয়। এরপর সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং দিকনির্দেশনায় জাদুঘর সংস্কারের কাজ ২০১৭ সালে সম্পন্ন হয় এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আর এই জাদুঘরটির নাম রাখা হয় ‘ভাই গিরিশচন্দ্র সেন স্মৃতি জাদুঘর’।

বাড়িটি সংস্কারে চুন-সুরকির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা মূল্যবান কাঠ ও টালি ব্যবহার করা হয়েছে। অন্দরমহল সাজানো হয়েছে ব্রিটিশ আমলের আসবাবপত্র দিয়ে। জাদুঘরে গিরিশচন্দ্র সেনের বাস্তুভিটায় আবিষ্কৃত প্রত্নতত্ত্ব এবং তার লেখা বই রাখা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহের রোববার ছাড়া অন্য ৬ দিন জাদুঘর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। গ্রীষ্মকালে (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৬টা এবং শীতকালে (অক্টোবর থেকে মার্চ) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক ও ট্যুরিস্ট গাইড মো. কাউসারুল হক কানন জানান, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য। রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্ম সমাজ। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য রামমোহন রায় আন্দোলন গড়ে তোলেন। সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। রামমোহন রায় যখন ১৮৩০ সালে মারা যান, তখন এই সমাজের অনুসারী হন ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, কেশবচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরও অনেকে। তখন এই সমাজ থেকে সভাপতি নির্বাচিত হন কেশবচন্দ্র সেন। কেশবচন্দ্র সেন চারজনকে চারটা ধর্ম নিয়ে রিসার্চ করার জন্য বলেন। ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের ভাগে পড়ে পবিত্র কোরআন। তারপরই তিনি কোরআনের অনুবাদটা করেন। অনুবাদ করতে সময় লাগে ১৮৮১ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত।

ব্রাহ্ম সমাজের নেতারা বলতেন, প্রত্যেক ধর্মের মধ্যে একটি সাধারণ সত্য আছে এবং প্রত্যেক ধর্মের মধ্যে একটি ভালো কথা আছে; যেমন আমরা জানি মুসলমান ধর্মের মধ্যে সুদ, ঘুষ ইত্যাদি হারাম। হিন্দু ধর্মের মধ্যেও অনেক কিছু নিষেধ। এজন্যই তারা প্রতিটি ধর্মের মধ্যে যে ভালো ভালো দিক আছে, সেগুলো নিয়ে একটি নতুন ধর্ম তৈরি করেন। যেটার নাম দেওয়া হয় ব্রাহ্মধর্ম।

জাদুঘরে গিরিশচন্দ্র সেনের ব্যবহৃত কোনো জিনিস আছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, চিনামাটির থালাবাটি ওই সময়ের। তবে উনার ব্যবহৃত না। এটি যেহেতু একটি জমিদারবাড়ি, আর জমিদারবাড়িতে যেমন জিনিসপত্র ব্যবহার করত, ওই সময়ের জিনিসপত্র দিয়ে এ জাদুঘরটি করা হয়েছে।

সম্প্রতি জাদুঘরটি চরম অযত্নের মুখে পড়েছে। পাঁচদোনার মেহেরপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, জাদুঘরটির সামনের রাস্তা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে রিকশার গ্যারেজ। সেখানে তৈরি করা হয় ব্যাটারিচালিত রিকশা। এ রিকশা তৈরি করতে প্রতিনিয়ত শ্রমিকরা রাস্তার ওপর রিকশার বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ঝালাই করছেন এবং যন্ত্রাংশ রেখে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছেন। তবে এসব ব্যাপারে কথা বলতে নারাজ রিকশার গ্যারেজের মালিকরা। এছাড়াও রাস্তার দুপাশেই মানুষের মলমূত্রসহ ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পড়ে রয়েছে।

জাদুঘরের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা বাড়িটিতে ব্যালকনিসহ ৬টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে নিচতলায় একটি ব্যালকনি ও দুটি কক্ষ এবং ওপরের তলায় একটি ব্যালকনি ও দুটি কক্ষ।

নিচতলার প্রথমেই রয়েছে একটি রিসিপশন কক্ষ, পরের কক্ষটা (ব্যালকনি) ভাষা গ্যালারি, পরের কক্ষটিতে ১৯ শতকের ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা। বাড়ির পেছন দিয়ে সিঁড়ির মাধ্যমে দ্বিতীয় তলায় উঠতে হয়। সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠলে প্রথমে একটি বিশ্রামকক্ষ, পরেরটি ব্যালকনি যেখানে মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি এবং পরের কক্ষটি বিশ্রামের জন্য। এসব কক্ষে নব্বই দশকে ব্যবহৃত তামা, কাঁসা ও চিনামাটির থালাবাটি, মুড়ির টিন, হ্যাজাক লাইট, হারিকেন, খড়ম (কাঠের জুতা), দোয়াত, ময়ূরের পাখনার কলম, রেডিও, কাপড় রাখার টাং এবং আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে- খাট, পালং, কাঠের আলনা, আলমারি, টেবিল ইত্যাদি। এছাড়া বাংলায় অনুবাদ করা পবিত্র কোরআন, গিরিশচন্দ্রের জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন বই, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বইসহ ইত্যাদি সংরক্ষণে রয়েছে। দর্শনার্থীরা চাইলে বইগুলো পড়তে পারবেন।

জাদুঘর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গিরিশচন্দ্র সেনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৩টি। তার মধ্যে বাংলায় পবিত্র কোরআনের অনুবাদসহ ইসলাম ধর্মবিষয়ক গ্রন্থ ২২টি।

পরিদর্শনে আসা ওসমান গণি খান নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের বাড়িতে আসার জন্য ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে যে গলি রাস্তাটি করা হয়েছে, তা এখন দখল করে রাখা হয়েছে। রাস্তার ওপর রিকশা তৈরি ও মেরামত করা হচ্ছে। এতে রাস্তা দিয়ে আসতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে।

ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলেন, ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্বেষণে প্রতি বছর অসংখ্য লোক এ মহামানবের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে আসেন নরসিংদীতে। তবে বাড়ির চারপাশ অপরিষ্কারসহ নানা অব্যবস্থাপনা রয়েছে। সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী আতিকা খান মারিয়া বলেন, আমরা পাঠ্যপুস্তকে গিরিশচন্দ্র সেনকে কোরআনের বাংলা অনুবাদক হিসেবে জেনেছি। কিন্তু এ মহান ব্যক্তির বাড়ি নরসিংদীতে হওয়া সত্ত্বেও তার জীবন ও কৃতকর্ম সম্পর্কে তেমন জানা সম্ভব হয়নি। আমরা সরকারের কাছে আশা করব, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে।

মেহেরপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, গিরিশচন্দ্র সেনের ভিটি বাড়িটি মূলত ১.৩৬ শতাংশের। পরে ভিটি বাড়িটির চারপাশে আরও ১.৫৮ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরে সরকার বাড়ির সামনে আরও ২.৪৬ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং বর্তমানে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন। জমি অধিগ্রহণের পর গিরিশচন্দ্র সেনের ভিটি বাড়িটির পরিমাণ হবে ৫.৪০ শতাংশ।

এ ব্যাপারে নরসিংদী জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন জাদুঘরটি নরসিংদী জেলার জন্য একটি ব্র্যান্ডিং। এটি নরসিংদীর একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এটা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি নরসিংদী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে।

দর্শনার্থী যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে জাদুঘরটি পরিদর্শন করতে পারেন, সে জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া চারপাশের যে অব্যবস্থাপনার কথা জানিয়েছেন, সে ব্যাপারেও দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় খরব আরো পড়ুন
© All rights reserved © 2026 Sanatani Research & IT Limited
Designed By Barishal Host