পুরান ঢাকার একটি মেস থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সাবেক শিক্ষার্থী মমতাজ আরা বর্ষাকে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই ধরনের দাবি উঠেছে। বর্ষার অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধের জেরে র্যাবের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তাকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে র্যাব ও পুলিশের দাবি, এটি কোনো অপহরণ বা তুলে নেওয়ার ঘটনা নয়। র্যাবের এক কর্মকর্তার বাসা থেকে প্রায় ৩৯ লাখ টাকার নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার চুরির মামলার তদন্তে চোরাই স্বর্ণের সূত্র ধরে বর্ষার নাম আসায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করতে অভিযান চালানো হয়েছিল।
রাজধানীর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের কলতাবাজার এলাকার একটি মেস থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীকে আটকের ঘটনায় র্যাবের বিরুদ্ধে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ করেছেন মমতাজ আরা বর্ষা। একই সঙ্গে এ ঘটনায় তার বোনের সাবেক স্বামীকে দায়ী করেছেন তিনি।
বর্ষার অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধের জেরে তার বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র্যাবের ওপর প্রভাব খাটিয়ে প্রতিশোধ নিতে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। বর্ষা জবির নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
২০২৩ সালে তিনি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
র্যাব বলছে, গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বর্ষাকে অপহরণ কিংবা তুলে নেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং এক র্যাব কর্মকর্তার বাসায় চুরির মামলার তদন্তে তার নাম আসায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করতে অভিযান চালানো হয়।
জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে র্যাব-২-এর সদর দপ্তরে কর্মরত সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হাসান মুহাম্মদ মোহতারিমের বাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। তার স্ত্রীও প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। তার বাসা থেকে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার ও অন্তত ১৫ লাখ টাকা খোয়া যায়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী তার বাসার গাড়িচালক ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার তদন্তে নেমে ওই দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে থানা পুলিশ। গাড়িচালকের স্ত্রীর মোবাইল ফোনে থাকা একাধিক অজ্ঞাত নম্বরের সূত্র ধরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বর্ষাকে শনাক্ত করে পুলিশ।
পরবর্তীতে সূত্রাপুরের কলতাবাজারের লবণের গোডাউনের মোড় এলাকার ওই বাসায় বর্ষাকে আটক করতে যায় র্যাব-২।
প্রথমে র্যাবের গোয়েন্দা দলের দুই সদস্য বাসায় গিয়ে বর্ষার অবস্থান শনাক্ত করেন। এরপর র্যাব-২-এর একটি দল ও র্যাব-১০-এর একটি টহল দল ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান নেয়।
পরবর্তীতে বর্ষাকে আটক করতে গেলে বাসায় থাকা শিক্ষার্থীরা প্রথমে আটকের কারণ জানতে চান। র্যাব সদস্যরা প্রথমে বিষয়টি স্পষ্ট না করলেও পরে আভিযানিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটকের কারণ জানায়।
এরই মধ্যে সাদা পোশাকে জবির সাবেক শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্ষাকে আটক করে র্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় মাঝপথে গাড়িটির গতিরোধ করা হয়। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ক্যাম্পাস সাংবাদিক, জবি ছাত্র সংসদের নেতারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক, সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির ও মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন উপস্থিত হন। পরে তারা র্যাবের কাছ থেকে বর্ষাকে রেখে দেন।
‘মব করে আসামি রেখে আসতে বাধ্য করেছে’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীকে আটক ও পরে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বাংলানিউজকে বলেন, ‘র্যাব পরিচয় নয়, আমরা র্যাব-২-এর পক্ষ থেকেই একজনকে আটক করতে গিয়েছি। সকল ধরনের নিয়ম মেনে একটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার অধিযাচনপত্রের প্রেক্ষিতে এ অভিযান হয়েছে। কিন্তু ভুল তথ্যের কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা মব করে আসামি রেখে আসতে বাধ্য করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ওই মামলার ভুক্তভোগী আমাদের র্যাব-২-এর এক কর্মকর্তা। তার বাসায় চুরির ঘটনার তদন্তে পাওয়া আসামিকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করতে গিয়েছিলাম।’
ঘটনার যেভাবে শুরু
গত দুই বছর ধরে র্যাব কর্মকর্তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন রাসেল। রাসেলের স্ত্রী মাসুরা বেগম নিজেকে ‘জ্বীনের বাদশা’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।
সরকারি দায়িত্ব পালনের কারণে বাসায় নিয়মিত অবস্থান না করার সুযোগ নিয়ে র্যাব কর্মকর্তার স্ত্রীকে নানাভাবে ভুল বোঝানো হয়। এমনকি ওই র্যাব কর্মকর্তা সম্পর্কে রাসেলের স্ত্রীকে তার কাছে থাকা জিন বিভিন্ন তথ্য জানায়—এমন কথা বলেও তাকে ফাঁদে ফেলা হয়।
এরপর জিনের মাধ্যমে চিকিৎসা ও স্বামীর কল্যাণের কথা বলে নানা ধরনের ওষুধ ও পানি পড়া দেওয়ার আড়ালে চেতনানাশক বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ওই কর্মকর্তার স্ত্রী শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাকে আরও কাবু করতে বিভিন্ন ধরনের চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এতে তিনি দুইবার মাইনর স্ট্রোক করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
স্ত্রীর বয়সের তুলনায় এমন অসুস্থতার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে ওই কর্মকর্তা দেখতে পান, তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ও তার স্ত্রী মিলে ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজির নামে তার স্ত্রীকে চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে বাসা থেকে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এমনকি ব্যবহৃত গাড়িটি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি কাউকে জানালে তার দুই সন্তানের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মাত্র দেড় মাসের মধ্যে কবিরাজির ফাঁদে ফেলে স্বর্ণ ও নগদ টাকা মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, র্যাব কর্মকর্তার গাড়িচালকের স্ত্রী একজন পেশাদার প্রতারক এবং রাসেল তার সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘জ্বীনের বাদশা’ পরিচয়ে প্রতারণা করে আসছিলেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। রাসেলের স্ত্রী মাসুরার কাছে ২৮টি সিম ও একাধিক বিকাশ অ্যাকাউন্ট পাওয়া যায়। এসব অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন নম্বর থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়ে পরে সেগুলো ব্লক করে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জানা যায়, র্যাব কর্মকর্তার সাবেক গাড়িচালক রাসেলের স্ত্রী মাসুরার গ্রামের বাড়ি নাটোর জেলার লালপুর থানার তিলকপুর গ্রামে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই গ্রামের অনেকেই ‘জ্বীনের বাদশা’ পরিচয়ে প্রতারণা ও মানুষের মোবাইল হ্যাক করার সঙ্গে জড়িত। এই প্রতারণার কাজের সূত্রেই রাসেলের সঙ্গে মাসুরার পরিচয় হয়। পরে তিনি গ্রাম ছেড়ে রাসেলের সঙ্গে জুরাইনের ধোলাইপাড় এলাকায় বাসা নেন। সেখানে বসেই দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে আসছিলেন বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
যেভাবে হাতানো হয় টাকা ও স্বর্ণ
গত ১২ আগস্টের ক্যান্টনমেন্ট থানার এজাহার অনুযায়ী, ২২ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মো. রাসেল ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ইসিবি চত্বরের একটি বাসায় যাতায়াত করেন।
সেখানে পানি পড়া, তাবিজ-কবজ ও কথিত বশীকরণের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা বলে নওরীন হককে নানা বিষয়ে বিশ্বাস করানো হয়।
অভিযোগ করা হয়েছে, এ সুযোগে কৌশলে বাসা থেকে নগদ ১৪ লাখ টাকা এবং প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণালংকার, যার আনুমানিক মূল্য ২৫ লাখ টাকা, নিয়ে যাওয়া হয়। সব মিলিয়ে বাদীর প্রায় ৩৯ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, কথিত জিনের নির্দেশ ও ভয়ভীতি দেখানোর কারণে নওরীন বিষয়গুলো বিশ্বাস করতে থাকেন। একপর্যায়ে আরও টাকা দাবি করা হলে তার সন্দেহ হয়। পরে তিনি বিষয়টি তার স্বামীকে জানান। এরপর বিষয়টি যাচাই করে পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, রাসেল ও তার স্ত্রী পরিকল্পিতভাবে জিন ও অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলে তার স্ত্রীর সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছেন।
কথিত পানি পড়া, তাবিজ-কবজ ও অন্যান্য কার্যক্রমের কারণে নওরীন হক শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ ছাড়া তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে বাদী জানতে পারেন, চুরি যাওয়া স্বর্ণালংকার পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকার এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এ বিষয়ে মোবাইল ফোনের কথোপকথনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মামলা দায়েরের পর তদন্তে চোরাই স্বর্ণালংকার কেনাবেচার বিষয়টিও সামনে আসে। মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার হলে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
চুরির ঘটনায় বর্ষার নাম যেভাবে আসে
জিনের বাদশা পরিচয়ে পরিবারের সদস্য ও স্বামীর ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে নিজের অজান্তেই মূল্যবান সম্পদ হারাচ্ছিলেন র্যাব কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী-এমনটাই মামলার তদন্তে উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। ধীরে ধীরে টাকা ও স্বর্ণ হাতিয়ে নেওয়ায় বিষয়টি বুঝতে দেড় মাসের বেশি সময় লেগে যায়। তখন তারা বুঝতে পারেন, ততক্ষণে প্রায় ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পরে ক্যান্টনমেন্ট থানায় র্যাব কর্মকর্তার করা মামলার তদন্তে রাসেল ও মাসুরা দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মোবাইল ফোনের লেনদেন ও বিভিন্ন অ্যাপের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেখতে পান, র্যাব কর্মকর্তার বাসা থেকে চুরি যাওয়া স্বর্ণের গন্তব্য পুরান ঢাকার তাতীবাজার এলাকা। স্বর্ণ বিক্রিতে ০১৬১০৩৮০ ও ০১৩১৭১৭৩ নম্বরের ব্যবহারকারীর সহযোগিতার তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নম্বর দুটির ব্যবহারকারী মমতাজ আরা বর্ষা নামে এক নারীকে শনাক্ত করা হয়।
এরপর গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) তাকে আটক করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন র্যাব কর্মকর্তারা এবং শেষ পর্যন্ত বর্ষাকে রেখে যেতে বাধ্য হন বলে র্যাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বর্ষা নিজেকে বাঁচাতে প্রথমে তিনবার জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করেন। পুলিশ আসতে দেরি করায় তিনি এক শিক্ষকের সহযোগিতা চান। ওই শিক্ষক সামনে না এলেও আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়েছেন বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
‘চমকে ওঠার মতো তথ্য পেয়েছি’
বর্ষা সম্পর্কে অভিযানে অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চুরির মামলা তদন্তে যখন বর্ষার নাম আসে, প্রথমে আমরা কিছুটা সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও তাতীবাজারের স্থানীয় একাধিক সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা চমকে ওঠার মতো তথ্য পেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘বর্ষা দীর্ঘদিন ধরে চোরাই স্বর্ণ বিক্রি চক্রের সঙ্গে জড়িত। তার তাতীবাজারে চোরাই স্বর্ণ কেনাবেচা করে এমন একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তাতীবাজারসহ বিভিন্ন স্বর্ণের মার্কেটে তার নিয়মিত যাতায়াতের প্রমাণও আমাদের হাতে এসেছে। এমনকি হিলি বন্দরকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে বর্ষার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।’
তার দাবি, গত জুলাই মাসেও বড় একটি স্বর্ণের বারের চালান বর্ষার হাত ঘুরে সীমান্ত এলাকায় গেছে। এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সঙ্গেও বর্ষার সম্পর্কের তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। র্যাবের দলের কাছ থেকে বর্ষাকে ছাড়িয়ে নিতে তিনি আড়াল থেকে ভূমিকা রেখেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন ওই কর্মকর্তা।
ঘটনার পর আর মেসে ফেরেননি বর্ষা
এদিকে র্যাব ছেড়ে দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে পারিবারিক বিরোধের জেরে আটকের অভিযোগ করলেও এরপর থেকে বর্ষা পলাতক রয়েছেন বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
ঘটনার পর তিনি আর তার মেসের বাসায় ফেরেননি বলে জানান মেসের শিক্ষার্থীরা।
বর্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে তার মেসের এক শিক্ষার্থী জানান, গত রোববার বাসায় র্যাবের উপস্থিতিতে তারা কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘যদিও পরে বর্ষাকে আটকের বিষয়টি নিয়ে আমরা র্যাবের সঙ্গে কথা বলি। প্রথমে তারা ভুল তথ্য দেয়। পরবর্তীতে তারা জানায়, ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি চুরির মামলায় জড়িত থাকায় তাকে আটক করতে এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে বর্ষা কিছু সময় নেয় নেকাব পরা ও নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। এরপর সে স্বাভাবিকভাবে তাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠে যায়। পরে রাস্তায় তার গাড়ি আটকে তাকে নামানো হয়েছে বলে শুনেছি।’
ওই শিক্ষার্থী আরও জানান, বর্ষা মাঝে মাঝে বাইরে থাকতেন। তার যোগাযোগ নম্বর কাউকে দিতেন না। নিরাপত্তার জন্য ফোন নম্বর দিতে সমস্যা হয়—এমনটাই বলতেন তিনি।
তিনি জানান, বর্ষা ২০১৮ সাল থেকে এই বাসায় থাকেন। তার রুমের অন্যদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক নেই। গত রোববার র্যাবের সঙ্গে বের হওয়ার পর আর তিনি বাসায় ফেরেননি। বাসার কারও কাছে তার নম্বর নেই। তাই তার সঙ্গে আর যোগাযোগও হয়নি।
‘আমরা মামলার বিষয়টি জানতাম না’
চুরির মামলার আসামিকে রাস্তা থেকে র্যাবের হাত থেকে নামিয়ে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা জানতাম না সে আমাদের সাবেক শিক্ষার্থী। পরে জেনেছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের আরেক সহকারী প্রক্টর মামলার কাগজ দেখাতে বলেছেন। সেটা দেখাতে না পারায় এটা হয়েছে। তারা মামলার বিষয়টি আমাদের কিছুই জানাতে পারেনি। কথাবার্তার মধ্যেই তারা আসামিকে রেখে চলে যায়।’
সাবেক শিক্ষার্থী বর্ষার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না জানতে চাইলে সালেহ উদ্দিন বলেন, তার সঙ্গে আগে কোনো যোগাযোগ হয়নি। গত রোববারের আগে তিনি তাকে কখনো দেখেননি।
সরকারি বাহিনীর কাজে বাধা দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, আমরা সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হলো তারা আমাদের কিছুই বলেনি। গ্রেপ্তারের যে কাগজ আছে, সেটা তারা দেখায়নি।’
পুলিশের ভাষ্য
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসান বাংলানিউজকে জানান, ‘থানায় দায়ের করা চুরির মামলার ভিত্তিতে চোরাই স্বর্ণালংকার কেনার অভিযোগ তদন্ত করতে র্যাব ওই অভিযান চালায়। এএসপির বাসা থেকে প্রায় ৩৯ লাখ টাকার নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার চুরি হয়েছিল। মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো মালামাল উদ্ধার হয়নি। এ বিষয়ে পুলিশ র্যাবকে রিকুইজিশন দিয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘এজাহারে মমতাজ আরা বর্ষার নাম উল্লেখ করে চোরাই স্বর্ণালংকার কেনার অভিযোগ করা হয়েছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে চুরি যাওয়া মালামাল সম্পর্কে তথ্য বা আলামত পাওয়া যেতে পারে, এমন তথ্যের ভিত্তিতেই র্যাব সেখানে গিয়ে থাকতে পারে।’
Leave a Reply