1. admin@sanataninews24.com : admin :
       
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩২ অপরাহ্ন
সংবাদের শিরোনাম
রাবিপ্রবির বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ডিএমপির তিন সহকারী পুলিশ কমিশনারকে বদলি নেই ডাক্তার, বিল ২ লাখ: শিশুর মৃত্যুর পর স্বজনের আহাজারি সুনামগঞ্জে নৌকাবাইচ ঘিরে উত্তেজনা, বন্ধের দাবি প্যানেল চেয়ারম্যানের অসুস্থ স্ত্রীকে কোলে নিয়ে বৃদ্ধের আহাজারি, ‘খাবার দাও আল্লাহ’ চলন্ত ফেরি থেকে নদীতে পড়ে ট্রলার মাঝি নিখোঁজ আদাবরে খণ্ড-বিখণ্ড লাশ, অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন চলাচল বন্ধ সাভারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল-ককটেল বিস্ফোরণ, আটক ৮ সড়ক দুর্ঘটনায় মুছে গেল বিয়ের আনন্দ, কনের ভাই-বোনসহ নিহত ৪

শব্দের মারপ্যাঁচে কি ঢাকা যাবে সংখ্যালঘুর নীরব কান্না?

  • প্রকাশিত সময় শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৪ বার পড়েছেন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে ব্যতিক্রমী। তিনি সাধারণত কথা বলেন প্রস্তুতি নিয়ে, প্রশ্নের উত্তর দেন যুক্তি দিয়ে এবং সাংবিধানিক বিষয়কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। ফলে তার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক হলে সেটিকে নিছক রাজনৈতিক বিরোধিতা বলে পাশ কাটানো যায় না। বরং তার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়েই প্রশ্ন করা দরকার। রাষ্ট্র কি সত্যিই সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, নাকি সমতার নাম করে কিছু অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে অভিধান থেকে মুছে ফেলতে চায়?

প্রশ্নটি সামনে এসেছে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচয় না দিয়ে দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, সবাই বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক। কেউ নিজেকে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচয় দেবেন না। পরিচয় হবে নাগরিকত্বের ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়। সবাই বলবেন, তারা সমান অধিকারভুক্ত নাগরিক।

কথাটি শুনতে চমৎকার। এত চমৎকার যে দেয়ালে লিখে রাখা যায়। সবাই বাংলাদেশি, সবাই সমান, সবার অধিকার সমান। এর চেয়ে সুন্দর রাষ্ট্রীয় নীতিবাক্য আর কী হতে পারে! সমস্যা হলো, সুন্দর বাক্য আর বাস্তবতা এক জিনিস নয়। অভিধান থেকে ‘বৈষম্য’ শব্দটি মুছে ফেললে বৈষম্যও মুছে যায় না। একইভাবে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি না বললেই সংখ্যালঘু মানুষের বাস্তবতা উধাও হয় না।

সংখ্যালঘু পরিচয় নাগরিকত্বের বিকল্প নয়। একজন হিন্দু নাগরিক একই সঙ্গে বাংলাদেশি এবং হিন্দু। একজন মুসলমান নাগরিকও একই সঙ্গে বাংলাদেশি এবং মুসলমান। নাগরিকত্ব হলো রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক। ধর্মীয় পরিচয় হলো ব্যক্তির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। দুটোকে পরস্পরের শত্রু বানানোর প্রয়োজন কোথায়? পরিচয় তো কোনো সরকারি ফরমের সেই ঘর নয়, যেখানে একটি টিক দিলে আরেকটি মুছে ফেলতে হবে।

বরং সংখ্যালঘু শব্দটির প্রয়োজন আছে একটি বাস্তবতা বোঝার জন্য। সংখ্যায় কম হওয়া শুধু গণিতের বিষয় নয়। এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক ক্ষমতা, নিরাপত্তা, সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং বৈষম্যের ঝুঁকি জড়িয়ে থাকে। সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু উভয়েই নাগরিক। কিন্তু তাদের সামাজিক অবস্থান সব সময় এক নয়। একজন সংখ্যাগুরু নাগরিকের যে নিরাপত্তাবোধ স্বাভাবিক, একজন সংখ্যালঘু নাগরিকের কাছে সেটি অনেক সময় প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

তাই কেউ নিজেকে সংখ্যালঘু বললে সেটি রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন তিনি নিজেকে সংখ্যালঘু মনে করছেন? তার অভিজ্ঞতা কী? কোথায় তিনি বৈষম্যের শিকার? কোথায় তার নিরাপত্তা নিয়ে ভয় আছে? কোথায় তার প্রতিনিধিত্ব কম? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নাগরিককে এই প্রশ্ন করা নয়, ‘তুমি সংখ্যালঘু বলছ কেন?’ এর চেয়ে দরকারি প্রশ্ন হলো, ‘তোমাকে সংখ্যালঘু বোধ করতে হচ্ছে কেন?’

এখানেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার বৈপরীত্য। তিনি একই সঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতা, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা এবং ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার সাংবিধানিক দায়িত্বের কথা বলেছেন। খুবই ভালো কথা। কিন্তু যদি সবাই বাস্তবে সমান ও নিরাপদই থাকেন, তাহলে এই নিরাপত্তার আশ্বাস বারবার দিতে হয় কেন? তালা না থাকলে চাবির বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

চট্টগ্রামের জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শুধু শ্রীকৃষ্ণের নাম করেননি। তারা সমঅধিকার, নিরাপত্তা, চাকরিতে অধিকার, হামলা, মামলা, মন্দির ভাঙচুর, দখল, অগ্নিসংযোগ এবং অপরাধীদের বিচারের দাবি তুলেছেন। তাদের প্ল্যাকার্ডে ছিল, অধিকার ভিক্ষা নয়, সংবিধানসম্মত সমঅধিকারের নিশ্চয়তা দাবি।

অর্থাৎ নাগরিকরা মন্ত্রীর কথার সঙ্গে মূলত একমত। তারা বাংলাদেশি। কিন্তু তারা এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশি পরিচয়টি যেন শুধু জাতীয় দিবসের বক্তৃতায় ব্যবহৃত একটি সুন্দর শব্দ না হয়। সেটির বাস্তব মূল্যও থাকতে হবে। নাগরিকত্বের সনদ তাদের আছে। এখন নাগরিকত্বের নিরাপত্তা ও মর্যাদাটিও তারা চান।

মন্ত্রী বলেছেন, অতীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি নির্দিষ্ট দলের ভোটব্যাংক হিসেবে দেখার রাজনৈতিক ধারণা জনগণ ভেঙে দিয়েছে। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে কোনো দলের স্থায়ী ভোটব্যাংক ভাবা অবশ্যই ভুল। কিন্তু ভোটব্যাংকের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উপায় সেই সম্প্রদায়ের পরিচয়টিই অস্বীকার করা হতে পারে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ শব্দটির আর প্রয়োজন নেই। এর বদলে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও শান্তির কথা বলা উচিত। এই কথাটিও নিঃসন্দেহে সুন্দর। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা কি শব্দের অভাবে আমাদের সমাজে টিকে আছে? ডাক্তার যদি বলেন, আজ থেকে ‘জ্বর’ বলব না, বলব ‘শরীরের ইতিবাচক উষ্ণতা’, তাতে কি রোগীর তাপমাত্রা কমবে?

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শব্দটির প্রয়োজন হয়েছে কারণ সাম্প্রদায়িকতা আমাদের সমাজে বাস্তব সত্য। কোথাও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। কোথাও উপাসনালয়ে হামলা হয়। কোথাও গুজবের ভিত্তিতে মানুষ আক্রান্ত হয়। তাই শব্দটি নিষিদ্ধ না করে সেই বাস্তবতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অবস্থান আরও শক্তিশালী করা দরকার। রোগের নাম উচ্চারণ না করলেই রোগী সুস্থ হয়ে যায় না।

শব্দের মারপ্যাঁচে কোনো জনগোষ্ঠির পরিচয় বা মূল সংকটকে আড়াল করার চেষ্টাটি অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের নতুন নয়। এর আগে তিনি ‘আদিবাসী’ প্রসঙ্গেও এমন কথা বলেছিলেন।

১১ অগাস্ট রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের একটিই পরিচয়, বাংলাদেশি। এখানে কোনো আদিবাসী গোষ্ঠি নেই। সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী।

এখানেও ছিল সেই একই সূত্র। সবাই বাংলাদেশি, অতএব আলাদা পরিচয়ের দরকার নেই। যুক্তিটি প্রথম শুনলে বেশ চমৎকার লাগে। কিন্তু ইতিহাসেরও যদি কান থাকে, সে নিশ্চয়ই এই বক্তব্য শুনে একটু হেসেছে। কারণ সবাই বাংলাদেশি হলেও সবার ইতিহাস এক নয়। পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠির ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন, ভূমি, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং জাতিসত্তার প্রশ্ন রয়েছে। ‘বাংলাদেশি’ বললেই এসব বাস্তবতা বিলীন হয়ে যায় না।

‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক আপত্তি আছে এবং ওই আপত্তির অবসান হওয়া দরকার। তারপরেও কেউ চাইলে বিকল্প পরিভাষা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু কোনো জনগোষ্ঠি নিজের ঐতিহাসিক পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে তাকে বলা যে সেই পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক, এটি সংলাপের পথ নয়। বরং এটি সমস্যার ওপর একটি নতুন নামফলক ঝুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

আয়না ভেঙে ফেললে মুখের দাগ থাকে না, এমন ধারণা একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল। এখন রাষ্ট্র যদি পরিচয়ের আয়নাটিই সরিয়ে দেয়, তাহলে হয়তো কাগজে সমস্যা কম দেখা যাবে। পরিসংখ্যানেও সুবিধা হবে। সবাই বাংলাদেশি। কেউ সংখ্যালঘু নয়। কেউ আদিবাসী নয়। কেউ পিছিয়ে নেই। বাহ! এবার উন্নয়নের রিপোর্ট লিখতে আর কোনো ঝামেলাই নেই। শুধু মাঠে গিয়ে মানুষগুলোকে এই সুখবরটি জানানো বাকি।

কিন্তু রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকের পরিচয় নির্ধারণ করা নয়। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। কেউ নিজেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জাতি-গোষ্ঠির সদস্য কিংবা আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দিলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত তার নাগরিক অধিকার রক্ষা করা। পরিচয়টি পছন্দ না হলে আলোচনা করা যায়। বিতর্ক করা যায়। আইন ও সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। কিন্তু পরিচয় অস্বীকার করে সমস্যার সমাধান করা যায় না।

সমতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবাইকে একই কথা বলা সমতা নয়। যে মানুষটি দৌড় শুরু করেছে পেছন থেকে, তাকে বলা যে ‘সবাই তো একই লাইনে’, এটি সমতা নয়। বরং কৌতুক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো কেন কেউ পিছিয়ে আছে তা দেখা।

কারও নিরাপত্তা কম। কারও প্রতিনিধিত্ব কম। কারও ভূমির অধিকার অনিশ্চিত। কারও ওপর হামলার ঝুঁকি বেশি। এসব বাস্তবতা চিহ্নিত না করে শুধু ‘সবাই সমান’ বললে রাষ্ট্র নিজেই নিজের প্রশংসা করতে থাকবে। আর নাগরিক বাস্তবতার সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়বে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তাই প্রত্যাশা একটু বেশি। ‘সবাই বাংলাদেশি’– এটা তিনি বলতেই পারেন। কিন্তু একই সঙ্গে বলতে হবে যে, বাংলাদেশি হওয়ার জন্য কাউকে হিন্দু পরিচয় গোপন করতে হবে না। বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান পরিচয় লুকাতে হবে না। কোনো জাতিসত্তার পরিচয় বিসর্জন দিতে হবে না। রাষ্ট্রের ছাতা সবার জন্য অবারিত। কিন্তু ছাতার নিচে দাঁড়ানো মানুষগুলোর মুখ একই রঙে রাঙানোর চেষ্টা না হোক।

কারণ পরিচয় মুছে সমতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। পরিচয়কে নিরাপদ করেই সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। রাষ্ট্রের অভিধান যতই সুন্দর হোক, নাগরিকের অভিজ্ঞতা যদি নিরাপদ না হয়, অভিধান দিয়ে শান্তি আসে না। ‘সবাই বাংলাদেশি’ একটি প্রয়োজনীয় সত্য। কিন্তু তার সঙ্গে আরেকটি সত্যও স্বীকার করতে হবে। এই বাংলাদেশে মানুষগুলো ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন জাতিসত্তা, ভিন্ন ইতিহাস ও ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে বাস করে। সেই ভিন্নতাকে ভয় নয়, অধিকার দিয়ে ধারণ করাই রাষ্ট্রের পরিপক্বতা। নইলে একদিন এমনও হতে পারে, রাষ্ট্র বলবে সবাই সমান। আর নাগরিক জিজ্ঞেস করবে, সমান তো হলাম, কিন্তু আমার সমস্যার নামটা কোথায়?

আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে যে, অধিকারহীন সম্প্রদায়ের নিঃশব্দ কান্না শব্দের মারপ্যাঁচে আড়াল করা যায় না।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় খরব আরো পড়ুন
© All rights reserved © 2026 Sanatani Research & IT Limited
Designed By Barishal Host