নড়াইল প্রতিনিধি: নড়াইলের কালিয়া উপজেলার দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক কম্পিউটার শিক্ষকের বিরুদ্ধে টানা ১৭ বছর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও সরকারি বেতন-ভাতা (এমপিও) গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে একদিনও পাঠদান না করলেও নিয়মিত তার ব্যাংক হিসাবে সরকারি বেতনের অর্থ জমা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষক পীযুষ কান্তি ঘোষ। তবে তিনি দাবি করেছেন, ২০০৯ সালেই বিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে অন্য পেশায় যোগ দেন এবং এরপর আর কখনো বিদ্যালয়ে যাননি। তার বক্তব্য, কীভাবে তার ব্যাংক হিসাবে সরকারি অর্থ জমা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে পীযুষ কান্তি ঘোষ দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিন বছর পর এমপিওভুক্ত না হওয়ায় ২০০৯ সালে তিনি ঢাকায় গিয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরও পরবর্তীতে তিনি এমপিওভুক্ত হন এবং প্রায় ১৭ বছর ধরে সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করে আসছেন। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে তার ব্যাংক হিসাবে প্রায় অর্ধকোটি টাকার সরকারি অর্থ জমা হয়েছে। এমনকি চলতি বছরের জুন মাসেও তার হিসাবে বেতন জমার তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ রয়েছে। কম্পিউটার শিক্ষক না থাকায় তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শত শত শিক্ষার্থী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এ সময়ের মধ্যে বিদ্যালয়ের দায়িত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক নীরঞ্জন কুমার বসু (১৯৮৪-২০১২), অনন্ত কুমার বিশ্বাস (২০১২-২০১৪), তুষার কান্তি ঘোষ (২০১৪-২০২২), গোলক চন্দ্র বিশ্বাস (২০২২-২০২৫) এবং পুনরায় তুষার কান্তি ঘোষ (২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে বর্তমান)। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই বেতন চালুর প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল।
অবসরপ্রাপ্ত দুই প্রধান শিক্ষক নীরঞ্জন কুমার বসু ও অনন্ত কুমার বিশ্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বর্তমান ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন।
সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলক চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমি আড়াই বছর দায়িত্বে থাকাকালে পীযুষের বেতন বন্ধ রেখেছিলাম। পরে বর্তমান প্রধান শিক্ষক যোগ দেওয়ার পর আবার বেতন চালু করা হয়।”
অন্যদিকে বর্তমান প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষ বলেন, “হাইকোর্টের একটি আদেশের কারণে বরখাস্ত থাকলেও তার প্রাপ্য অর্থ হিসাবে জমা হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের প্রক্রিয়া অনুযায়ী তিন মাস বেতন চালু ছিল, পরে আবার তা বন্ধ করা হয়। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন চালুর বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
অভিযুক্ত পীযুষ কান্তি ঘোষ বলেন, “২০০৯ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। এরপর বিদ্যালয়ে আর যাইনি। সম্প্রতি জানতে পেরেছি আমার নামে বেতন উত্তোলনের বিষয়টি। এত বছর আমি ওই ব্যাংক হিসাবে কোনো লেনদেন করিনি। কীভাবে টাকা জমা হয়েছে, তা আমার জানা নেই। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।”
এ বিষয়ে কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিন্নাতুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. জালাল উদ্দিন বলেন, “২০০৯ সাল থেকে একজন শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও সরকারি বেতন-ভাতা পেয়েছেন—এটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। একজনের পক্ষে এমনটি সম্ভব নয়। তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
Leave a Reply